আমার “ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডার” হয়েছে, আপনার ?

ফেসবুকে আছিস? ফেসবুকে কি নামে পাবো? ফেসবুক আইডি আছে? এইসব ফেসবুকীয় ডিএনএ এখন নানা প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফেসবুক লাইক, ফেসবুক পেজ, ফেসবুক শেয়ার ইত্যাদির মাধ্যমে লোকমুখ হয়ে মনুষ্য মস্তিস্কে নিয়মিত হানা দেয়। পরিস্কার ভাবে বলতে গেলে ফেসবুক আমাদের বানিয়েছে তার পাহারাদার। কোনরকম একটা ছবি বা একটা স্ট্যাটাস দেবার পরক্ষণেই শুরু হয় তার পাহারাদারিত্বের ভার। ১৮বছরের আগে আমরা ভোট দেওয়ার অধিকার না পেলেও জন্মলগ্নের পর পরেই আমরা পেয়ে যাই ফেসবুক ব্যবহারের অধিকার। ইন্টারনেট নজরদারির ওয়েবসাইট ইন্টারনেট লাইভ স্ট্যাটাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। বিশ্বের অনেকের কাছেই এখন ইন্টারনেট আর ফেসবুকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উন্নয়নশীল দেশের অনেকেই ইন্টারনেট বলতে শুধু ফেসবুককেই বোঝেন। ফেসবুকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮০ কোটি যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৪২ কোটি। অর্থাৎ বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশের ফেসবুক আইডি আছে এবং প্রতি মাসে অন্তত একবার হলেও তারা ফেসবুকে ঢোকেন।

ফেসবুক জানাচ্ছে, এই পৃথিবীর ৯ জন লোকের ভিতরে দৈনিক ১ জন ফেসবুকে থাকে। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী গড়ে প্রতিদিন ৫৫ মিনিটের বেশি সময় ফেসবুকে কাটায়। যারা মোবাইলে ফেসবুক ব্যবহার করে তারা অন্যদের থেকে দ্বিগুণ সময় কাটায় ফেসবুকে। আর ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মানুষদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক চেক করে। মনুষ্য প্রজাতির ফেসবুকের প্রতি এই আসক্তি নতুন আশঙ্কারও জন্ম দিচ্ছে। এই এক স্মার্ট ফোন আর ফেসবুক মিলে পুরো একটা জেনারেশনকে অসামাজিক করে তুলছে। অসামাজিক এই অর্থে যে ৩ জন রুমমেট একসাথে থাকলেও এখন আর আড্ডা হয় না, যে যার মত ফেসবুক চালিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই । কথা বলার এখন আর সময় হয় না। এখন কথা হয় ফেসবুকে । মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা খুব বেশি ফেসবুক ব্যবহার করেন তারা নতুন একটি ব্যাধিতে ভুগছেন। তারা এই আসক্তির নাম দিয়েছেন “ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডার”। মনোবিজ্ঞানীদের দাবী, প্রতি ৪ জন ফেসবুক ব্যবহারকারীর একজন এই “ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডার”-এ আক্রান্ত!

ফেসবুকে অতিমাত্রায় আসক্তি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে হুমকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সাউথ ইন্ডিয়ান শর্ট ফিল্ম “গিভ মি অ্যা কিস”-এ পরিচালক  জিকে অত্তাপালাম দেখিয়েছেন গ্রামে বেড়ে ওঠা কিশোর মানু কিভাবে ফেসবুকে আসক্ত হয়ে মা-বাবা, ভাই-বোনের সাথে খারাপ আচরণ করা শুরু করে। ফেসবুক আসক্তি কিশোর মানুকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যায় যে যেকোন উপায়ে হোক তাকে মুম্বাই যেতেই হবে। বাবার কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমায় একটা কোর্স করার নাম করে। বাবা-মা’কে কোর্সের কথা বললেও তার মূল উদ্দ্যেশ্য ছিলো ফেসবুকের সেই বান্ধবীর সাথে দেখা করা। কিন্তু সেই ফেসবুকের বান্ধবীর সাথে দেখা হওয়ার পর কিশোর মানু বুঝতে পারে ফেসবুকের গার্লফ্রেন্ড আর বাস্তবের গার্ল্ডফ্রেন্ড এক না। একটা বাস্তব আর একটা ভার্চুয়াল। ভার্চুয়ালরা কখনো বাস্তবের বন্ধু হতে পারে না। এরপর সে তার ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভ করে দেয়, ফিরে আসে মায়ের কোলে। পরিচালক দেখিয়েছেন, ফেসবুক আসক্তি থেকে ফিরে এসে কিশোর মানু তার বাবা- মায়ের কাজে কিভাবে হেল্পফুল হয়ে ওঠে। ছোট আদরের বোনের কাছে হয়ে ওঠে সত্যিকারের বড় ভাই।

ফেসবুক দুনিয়ার নির্মিত ব্যক্তিরা পরিচিত হয়ে থাকে ফেসবুক বন্ধু হিসেবে। এই বন্ধুত্বের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুর প্রতি আকর্ষনের প্রভাব ফেসবুকীয় আসক্তিকে আরো বেগতিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী পরিচিত, অপরিচিত বিভিন্ন কিসিমের মানুষকে বন্ধু তালিকায় যুক্ত করে। ইন্টারনেট লাইভ স্ট্যাটাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে একজন ফেসবুক বাবহারকারি ১০৮ টি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে থাকে এবং একজন বাক্তি মাসে গড়ে ৮ টি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু গবেষকরা জানিয়েছেন, একজন মানুষ কোনভাবেই ৪ হাজার, ৫ হাজার বন্ধুর কথা মনে রাখতে পারে না। যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানী ডানবার বলেন, আমাদের গড়ে ৫ জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ১৫ জন সেরা বন্ধু, ৫০ জন ভালো বন্ধু এবং ১৫০ জন সাধারণ বন্ধু থাকতে পারে। এর বাইরে ৫০০ জন থাকতে পারে জানাশোনা টাইপের আর ১ হাজার ৫০০ জন একবার দেখার মানুষ টাইপের। এর বাইরে আর কাউকে ধারণ করা কারও মস্তিষ্কের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে  ডানবারের গবেষণা মতে, সব মিলিয়ে বন্ধু থাকতে পারে ২২০ জন, আর পরিচিতসহ  জানাশোনা আছে এমন সব মিলিয়ে থাকতে পারে ২ হাজার ২০০ জন। তাহলে ফেসবুকের লিমিট করে দেয়া ৫ হাজার বন্ধুর বাকি ২ হাজার ৮০০ বন্ধুর কি হবে? গবেষকদের মতে ফেসবুকে যার বন্ধু যত বেশি সে ততবেশি ফেসবুকে আসক্ত।  কিন্তু আমাদের এই নতুন নতুন বন্ধু সৃস্টির মাধ্যমে ফেসবুকর প্রতি আমরা হই আসক্ত আর মার্ক জাকারবার্গের একাউন্টে জমা হতে থাকে ডলার। বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোন ফেসবুক ইউজার একজন নতুন বন্ধুর রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার সাথে সাথে অটোমেটিক ফেসবুক লাভ করে থাকে ০.০০৩ ডলার। তাহলে হিসেব করতে থাকুন ফেসবুক ব্যবহার করছেন নাকি জাকারবার্গের সম্পদ বাড়াচ্ছেন।

Please share with



Name : জাবির হোসাইন
Email : zabir38@gmail.com

Comment Section


Post Your Comment
Name

E-mail

Comment