গবেষকের লিঙ্গীয় ব্যবচ্ছেদ এর গল্প

অনেক কসরত করেও সবজান্তা গুগলের কাছ থেকে বাংলাদেশে ‘নারী’ গবেষকদের সংখ্যা কিংবা পরিমাণ জানতে পারলাম না। নারীকে এখানে কমার মধ্যে আটকে রেখেছি কারন কোনো পুরুষ গবেষকের বেলায় আলাদা করে ‘পুরুষ’ গবেষক বলে উল্লেখ করা বা পরিচিতিকরণ করা হয় না। অথচ সমাজ দ্বারা নির্ধারিত নারী-পুরুষের লিঙ্গীয় বিভাজনে গবেষক’এর লিঙ্গ যখন নারী তখন পৃথকভাবে বলা হয় আমাদের সাথে আছে ‘নারী’ গবেষক ওমুক-তমুক! অথচ আমরাই সমাজের পক্ষপাতদুষ্ট লিঙ্গীয় বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করি কারণ আমরা উন্নয়নকর্মী! তাই পরিচিতিকরণ থেকে আরম্ভ করে ব্যক্তিগত জীবন- ঘর এবং পেশাগত জায়গা- অফিস থেকে মাঠ সবখানে এই ‘অন্যতাকরণ’এর মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমার মতো ‘নারী’ গবেষকদের। দু:খিত, এগুলোকে আমি চ্যালেঞ্জ বলতে আগ্রহী নই। কেননা এই পিতৃতান্ত্রিক বাংলাদেশে গবেষকের মধ্যেও বিভাজন তৈরী করা কেবল সরল বাক্যে ‘চ্যালেঞ্জ’ শব্দটির উপরে দায় চাপিয়ে ‘অন্যতাকরণ’এর  রাজনীতিকে আড়াল করতে চাই না। আজকের গল্পগুলো এই রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই  এগোবে।

‘নারী’ গবেষকের অভিজ্ঞতার গল্পগুলোকে দু-ভাগে ব্যবচ্ছেদ করা যায়: ব্যক্তিগত এবং পেশাগত। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মেয়েরা যখন নৃবিজ্ঞান কিংবা সমাজবিজ্ঞান এই ধরনের সমাজ গবেষণামূলক বিভাগে অধ্যয়ণের সুযোগ পায় তারপর থেকেই শুরু হয় পরিচিতজনদের পরামর্শ প্রদান। কারন গবেষক হলে গবেষিত মাঠে যেতে হবে, বাইরে বাইরে ঘুরতে হবে। আর মেয়েরা সারাজীবন মাঠে ঘুরলে সংসার করবে কিভাবে? সংসার, সন্তান সামলাবে কে? ফলে সংসার সামলানোর মত বৃহৎ দায়িত্বে অবহেলা না করবার জন্য কিছু মেয়ে বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষকতা ইত্যাদিতে চাকুরি পাবার পড়াশুনা শুরু করে। আর যারা আমার মত ফাঁকিবাজ তথা খ্যাপবাজ, ভ্রমণপিপাসু মেয়ে অবশিষ্ট থাকে তারা গবেষক হতে চায়। কিন্তু গবেষক হলেও তো বিয়ের সুতোয় বাঁধা পড়তেই হয়। বিয়ের পরে মাঠ-কর্ম করার জন্য বাড়ির বাইরে গেলে সঙ্গীটির বারবার বাড়ি ফেরার তাগিদ দেয়ার ফলে গবেষণা ও সংসার নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে ভোগে ‘নারী’ গবেষক। এভাবে কিছুদিন গবেষণা চালিয়ে যেতে পারলেও গর্ভধারণের পরে বাধ্য হয়ে গবেষণায় ইস্তফা দিতেই হয়! কারণ সিমন দ্য ব্যুভয়ার, শুলামিথ ফায়ারস্টোনদের মত ওতটা সাহসী নয় এদেশীয় নারীরা। চাকুরি জীবনের সফলতা কিংবা পিছিয়ে না পড়বার জন্য মাতৃত্বে বিলম্ব করবার কিংবা ‘নো চিলড্রেন, নো বার্ডেন’  বলবার মত দু:সাহস হয়নি এদের। তাই আবারো লিঙ্গীয় শ্রম বিভাজনের কারনে পিছিয়ে পড়ে ‘নারী’ গবেষক।

ব্যক্তিগত দোটানা সাময়িক সময়ের জন্য মোকাবেলা করা সম্ভব হলেও পুরুষ গবেষক সহকর্মীদের টিপ্পনীর হাত থেকে মুক্তি লাভ ঘটে না। তাই দুপুরের খাবার গ্রহণের বিরতিতে গল্পের তথা হাসাহাসির হট টপিক হয় ‘উইমেন রাইটস আর হিউমেন রাইটস’ অর্থাৎ তাদের ভাষায় ‘নারী অধিকার ও পুরুষ তথা মানুষের অধিকার’। এরপর গবেষিত এলাকায় যাবার সময়ে শুনতে হয়, ‘এই মহিলাদের নিয়ে গেলে বিপদ। ভাল জায়গায় থাকতে দিতে হবে, সন্ধ্যার পর কাজ করবে না, নিরাপত্তা দিতে হবে কতকিছু লাগে! আমরা ছেলেরা যাব, যেখানে জায়গা পাবো থাকবো, এত নখরা নাই! ভাই অন্য টিমে মেয়ে দিলে হয় না? নো ওমেন, নো ক্রাই!’ এসব বলে যে কারুর হাসি দেখতে হয় তাতে নিজেদের ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হয়! সেই সাথে কান দুটোকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়! কারণ আপনারাই তো মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করেন তবে এমন সেক্সিস্ট মন্তব্য কিংবা আচরণ কিভাবে করেন ভেবে কূল পাই না। তবে কি সবটাই পেটের দায়ে? স্রেফ চাকুরি? আসলে মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ কি কোথাও নেই? ভাষার নৃবিজ্ঞান কোর্স-এ লেভ্ ভিগৎস্কি’র তত্ত্বে পড়েছিলাম- ভাষা, চিন্তা ও আচরণের সাথে ভীষণভাবে সম্পর্কযুক্ত একটি ব্যাপার! ফলে বলা যেতে পারে কৌতুক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো সময়ে আপনারা যা বলেন তা মূলত আপনাদের ভাবনা ও বিশ্বাস থেকেই উৎসারিত হয়। নিরাপদ স্থানে থাকা কিংবা সন্ধ্যার পরে কাজ করতে না পারার দায়ভার কি নারীর নিজস্ব সমস্যা নাকি তা পুরুষ সৃষ্ট? যে সমাজে নারীর সতীত্বকে পূজা করা হয়, বিয়ের সময়ে ১২-১৬ বছর বয়সী মেয়েদের চাহিদা অনেক বেশী থাকে, ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে ধর্ষকের সাথে বিবাহ দেয়াকে পূণ্য বলে ভাবা হয় সেখানে ‘নারী’ গবেষকের উপরে তার নিরাপত্তাহীনতার দায়ভার চাপিয়ে দেয়া গবেষক হিসেবে কতটুকু কাম্য? ‘নো ওমেন, নো ক্রাই’ যখন শুনি তখন খুব বলতে ইচ্ছে করে এই কান্নার সুযোগ পেয়েছেন কোনো এক ‘ঝামেলাময়’ নারী আপনাদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল বলেই! সেদিন যদি সেই ‘ঝামেলাময়’ নারীটি বলত ‘নো চিলড্রেন, নো বার্ডেন’ তবে আজ ‘নো ওমেন, নো ক্রাই’  বলতে পারতেন না! এতো গেলো অফিসের অভ্যন্তরীণ চিত্র! গবেষিত এলাকায় যাবার পরে ‘নারী’ গবেষক যদি দলনেতা হয়ে থাকেন আর সেই দলে যদি একটি মাত্রও পুরুষ গবেষক থেকে থাকে তবে লোকজন পুরুষটির প্রতি বিশেষ  মনোযোগী হয়ে উঠে কারণ সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস ও চর্চা হলো ‘মেয়েরা কম বোঝে কিংবা মেয়েদের বুদ্ধি কম’। আর পুরুষ দলনেতার দলে ‘নারী’ গবেষক থাকলে কোনো উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের উদ্দেশ্যে সময় নিতে হলে পুরুষ দলনেতা ‘নারী’ গবেষককে দ্বিধাহীন কন্ঠে বলেন, ‘আপনি কথা বলেন আপা তাহলে বেশী সময় দিবে আর বেশী কথাও বলবে’। এই চিন্তার মধ্য দিয়ে নারীকে গবেষক নয় স্রেফ ‘নারী’ হিসেবে পরিবেশনের প্রবণতা খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠে। আবার মাঠে যাবার পরে রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্যে হোটেল ভাড়া নিতে গেলে হোটেল বয় কিংবা হোটেল ম্যানেজারের আচরণে মনে হয় তারা ‘নারী’ গবেষককে ঠিক ঘর ভাড়া দিচ্ছে না বরং বিনামূল্যে আশ্রয় দিচ্ছে! তাই কয়েকজন পুরুষ গবেষকের সাথে একজন ‘নারী’ গবেষক দেখলে ‘একজন মেয়েকে’ তারা ঘর ভাড়া দিতে আগ্রহী হয় না। এমন বিড়ম্বনায় বহুবার পরতে হলেও বন্দরনগরী চট্রগ্রামের অভিজ্ঞতাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। চট্রগ্রামে একজন পুরুষ গবেষকের সাথে একজন ‘নারী’ গবেষক হিসেবে আমি গিয়েছিলাম বেশ কিছুদিন পূর্বে। সেখানে পৌঁছানোর পরে পাঁচ থেকে ছয়টি হোটেল পরিদর্শনের পরে সেগুলোর প্রত্যেকটিতে উঠতে চাইলে একজন নারী ও একজন পুরুষ পৃথক ঘর ভাড়া নেবে শোনার পরে তারা জানায়, ‘যদি আপনারা একঘরে দুইজন উঠেন তাহলে ঠিক আছে কিন্তু এক ঘরে একা একটা মেয়ে মানুষ থাকতে পারবে না’।  আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমরা তো স্বামী-স্ত্রী নই, সহকর্মী। একঘরে কিভাবে উঠব’? এই প্রশ্নের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে ম্যানেজার অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, ‘এরকমই নিয়ম’। অবিবাহিত দুজন নারী-পুরুষ একত্রে রাত্রিবাস করতে পারবে তাতে কোনো অসুবিধে নেই কিন্তু পৃথক ঘরে উঠলে নারীর নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হবে এমনটিই ভাবেন তারা। সে যাত্রায় শেষ অব্দি আমাকে বোর্ডিংয়ে উঠতে হয়েছিল। সিলেটে একই রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হতে হয়েছিল আমার অপর এক ‘নারী’ গবেষক বন্ধুকে। আবার সিলেটে চারজন পুরুষ গবেষকের সাথে আমি একা কোনো খাবার হোটেলে খেতে গেলে হোটেল বয় বলে, ‘আপা কেবিন আছে, কেবিনে বসেন’। চারজন ছেলের সাথে একটি মেয়ের আবদ্ধ কেবিনে বসা কি বেশী নিরাপদ কিংবা শোভনীয় বাইরে সবার সাথে বসার চেয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর আজো খুঁজে পাইনি! উপকূলীয় অঞ্চলে কিংবা চরাঞ্চলে গবেষণা করতে গেলে পার্টনার এনজিও’র কর্মীদের প্রথমেই উক্তি থাকে, ‘আপা এটা তো অনেক দূর, অনেকক্ষণ হাঁটতে হবে, যেতে পারবেন তো? তারচেয়ে কাছের কোনো গ্রাম দেই আপনি কাজ করে চলে যান’। নারী হলেই তারা দূর্বল কিংবা কষ্ট করতে পারবে না এমন এক ধরনের ভাবনা থেকেই এই স্থানীয় ‘উন্নয়নকর্মীরা’ এসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন আমাদের ‘নারী’ গবেষকদের।

সকল বাঁধা, প্রতিকূলতা কিংবা পিতৃতান্ত্রিক ভাবনার ঘোর-টোপে আবদ্ধ থাকতে হলেও কিছু সংখ্যক ‘নারী’ গবেষণা ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখছেন। হয়ত মানুষের জন্য তথা মেয়েদের জন্য কিছু করার ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে গবেষণা পেশাটিকে ভালবেসে নয়ত স্রেফ জীবিকা নির্বাহের তাড়া থেকে হলেও মেয়েরা গবেষক হয়ে উঠছে। এভাবেই আশা রাখি এক সময় ঘরের মানুষটি বুঝবে তার সঙ্গীনির গবেষণার প্রতি ভালবাসাকে এবং ঘরের পরেই প্রিয় জায়গা অফিসটি হয়ে উঠবে গবেষকের লিঙ্গীয় ব্যবচ্ছেদহীন। ‘নারী’ গবেষক নির্বিঘ্ন চিত্তে বলবে তখন ‘দিনশেষে প্রাপ্তি এটাই যে আমার বলবার মত কিছু গল্প থাকে আর কিছু অভিজ্ঞতা থাকে যা আমাকে অবচেতন মনেই হাসাতে পারে তাই আমি গবেষক,  ভালবাসি গবেষণা’!

Please share with



Name : শারমিন আখতার
Email : sharminju39@gmail.com

Comment Section


Post Your Comment
Name

E-mail

Comment