মাঠকর্মের অভিজ্ঞতাঃ পাঁচ টাকা দিবার লাগবে

জ্ঞান অন্বেষণ কিংবা অভিজ্ঞতা সঞ্চার যাই বলিনা কেন জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুঁড়িকে পরিপূর্ণ করতে ভ্রমণের কোন বিকল্প নেই। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অসংখ্য লেখক, দার্শনিক, সাহিত্যিকগন তাদের বিভিন্ন লেখনী ও দর্শনচিন্তায় ভ্রমণের তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। এই রকম একজন দার্শনিক হলেন ম্যাথু কার্সটেন যিনি বলেন ‘‘ভ্রমণের জন্য বিনিয়োগ করার অর্থই হলো নিজের জন্য বিনিয়োগ”। প্রবল ব্যক্তি ইচ্ছা ও কাজের প্রকৃতির জন্য আমাকে প্রায়শই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হয় এবং মিশতে হয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে। আমার কর্মস্থল ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের সুবিধা নিয়ে আমার পঞ্চ-ইন্দ্রীয় বিচিত্র ধরনের অভিজ্ঞতার স্বাদ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি আমার বর্তমান অফিস Development Research Initiative (dRi) হতে একটি গবেষণা প্রকল্পের (Impact study of property Rights Initiative Project-2016 of BRAC Human Rights and Legal Aid Services) মাঠকর্মের জন্য গিয়েছিলাম নওগাঁ ও দিনাজপুর জেলায়। তথ্য সংগ্রহের কাজ পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রতিবারের ন্যায় এবারও নতুন কিছু অভিজ্ঞতার স্বাদ আমি পেয়েছি। ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতার একটা দিক হলো এর স্বাদ পরিপূর্ণভাবে অন্যকে বোঝানো যায় না সেটি লেখা, ফটোগ্রাফী বা গল্প বলা তা যেকোন মাধ্যমেই হোক। কারণ আমরা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পারি না আমরা বাস্তবতার কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করি মাত্র। এই চেষ্টার অংশ হলো আমার এই লেখা যা হয়তো কিছুটা হলেও আমার অভিজ্ঞতা আপনাদের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হবে বলে আশা রাখি। 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের যোগাযোগ ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থায় ব্যাপক অগ্রগতির ফলে গ্রাম আর শহরের মধ্যে পার্থক্যটা আর আগের মত দৃষ্টিগোচর হয়না। যে চকলেট আমরা ঢাকাতে বসে খাই, সেই একই চকলেট গ্রামে দেখা যায়। যে ডায়াপার/প্যামপার্স ঢাকাতে বাচ্চাদেরকে পরতে দেখা যায়, সেই একই ডায়াপার/প্যামপার্স কম হলেও গ্রামে চোখে পড়ে। এমনকি ঢাকার চাইনিজ হোটেলে যে ফ্রেঞ্জ ফ্রাই আমরা খাই তা এখন বিভিন্ন উপজেলা শহরে সহজেই পাওয়া যায়। আবার বর্তমান সময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহুরে তরুণ-তরুণীদের হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে থাকা ফেসবুকের ব্যবহারও গ্রামে দেখা যায় অত্যাধিক মাত্রায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অতীব প্রয়োজনীয় সব জিনিসের অভিন্নতার কারণেই আসলে দাম বা খরচের ক্ষেত্রেও গ্রাম আর শহরের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায় না। শহর আর গ্রামের মধ্যকার এই অভিন্নতার কারণে গ্রামকে আর আগের মত গ্রামীণ রূপে দেখতে পাওয়া যায় না। গ্রাম ও শহরের অভিন্নতাকে মেনে নিলেও সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মতো জ্ঞানকাণ্ডের পরশ কিছুটা হলেও জ্ঞানপিপাসু মনে থাকার সুবাদে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির কারণ ও প্রাসঙ্গিকতা দেখার কিঞ্চিত চেষ্টা প্রায়ই করে থাকি। এই কিঞ্চিত চেষ্টাই আমাকে এবার নতুন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে ভূমিকা রেখেছে। 

বলে রাখা ভালো যে আমাদের এবারের কাজটি ছিল সম্পত্তির ভাগ বন্টন ও নারীর অধিকার বিষয়ে। এই গবেষণার ফিল্ড ছিল নওগাঁ ও দিনাজপুর জেলায়। নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আমীনের (যিনি জমি পরিমাপ করেন) কাছে যাওয়ার জন্য একদিন সকালে বের হই এবং বেলা সাড়ে দশটার দিকে আমি মেছের বাজারে পৌঁছাই। এই বাজার থেকে ভ্যান বা অটোরিক্সার  সাহায্যে আমাকে আমার গন্তব্যস্থল কলেজ মোড়ে যেতে হবে। বাজারে পৌঁছে কোন অটোরিক্সা বা ভ্যান না পেয়ে আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশের  বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম। প্রায় ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কোন গাড়ি না পেয়ে গন্তব্য অভিমুখে একটু এগিয়ে যাই এবং রাস্তার পাশে ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চাশোর্ধ এক চাচাকে দেখতে পেয়ে তার কাছে যেতে থাকি। আমি তখনও জানতাম না যে দিনের সবচাইতে ভালো মূহুর্তটুকু আসবে ঐ পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিটির কাছ থেকে। যাইহোক ভ্যান নিয়ে আমার গাড়ি পাবার অপেক্ষাকে বিদায় দেবার আশা নিয়ে আমি ঐ চাচার কাছে যাই। ভ্যানওয়ালা চাচা ও আমার মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তা আলোচনার উদ্দেশ্য বোঝাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বোধ করে তা দেয়া হলোঃ

চাচা: কি বাবা কোথায় যাবিন?

গবেষক            : চাচা, আমি তো কলেজ মোড় যাব।

চাচা: এই দিকে (বাজারের পূর্বদিক) যাওয়া লাগবো।

গবেষক            : চাচা আপনি যাবেন?

চাচা: আপনি একা যাবিন?

গবেষক            : হ্যাঁ, চাচা একাই যাব। যাবেন আপনি?

চাচা: যাব, একা গেলে পাঁচ টাকা দিবার লাগবো।

গবেষক            : চলেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে ভ্যানওয়ালা চাচা যখন বললো ‘‘আপনি একা যাবিন” তখন আমি স্বাভাবিকভাবেই ভেবে নিয়েছিলাম আমাকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি টাকা দিতে হবে এবং আমি বেশি টাকা দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুতও ছিলাম। কারণ আমার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া ছিল। তবে আমি ভেবেছিলাম চাচা আমার কাছে ৩০/৪০ টাকা চাইবে। কিন্তু চাচা যখন আমার কাছে ৫ টাকা চাইলো তখন আমি একটু চমকে উঠি। ভুল শুনেছি ভেবে পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করি। কিন্তু তিনি প্রথমবারের মতই বললেন পাঁচ টাকা। যখন আমি নিশ্চিত হলাম যে আমাকে পাঁচ টাকাই দিতে হবে তখন আমি নিজের ভাবনার কাছে নিজেই পরাজিত হয়ে আনন্দিত ও ভাবুক মনে ভ্যানে উঠে যাত্রা শুরু করি। ভ্যানে বসে আমি আমার ভাবনার এই পরাজয় তথা ৫ টাকা ভাড়া চাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করলাম।   

জীবনের বড় একটা সময় উত্তরবঙ্গে থাকার (বসবাস করা) সুবাদে আমার এই অভিজ্ঞতা আছে যে আমাদের দেশের অ-উত্তরবঙ্গীয় (যারা উত্তরবঙ্গের নয়) লোকেরা সামান্য কারণেই উত্তরবঙ্গের লোকদেরকে অতি সহজ-সরল, বোকা, এমনকি ‘মফিজ’ বলার মাধ্যমে আনন্দের খোরাক নিয়ে থাকে। আমি আমার এই উত্তরবঙ্গীয় অভিজ্ঞতার সাথে ৫ টাকা ভাড়া চাওয়ার ঘটনাটা মেলাতে চেষ্টা করি। কিন্তু আমার মন সায় না দেয়ায় বিষয়টি আরও পর্যবেক্ষণের জন্য রেখে দিই। 

কাজ শেষে সন্ধ্যায় যখন আমি ফিরে আসি তখন হরিরামপুর নামক একটি মোড়ে নামি। সেখান থেকে রুমে ফেরার জন্য ভ্যানের সাহায্যে হোটেলের সামনে নেমে ভ্যান ওয়ালাকে ১০ টাকার একটি নোট দিলাম এই ভেবে যে এই দুরত্বে ভাড়া কোনভাবেই ১০ টাকার কম নয়। যাইহোক ভ্যানওয়ালা আমাকে ৫ টাকার একটি কয়েন ফেরত দিতেই আমি আমার গন্তব্যের দিকে হাঁটা ধরলাম। কিন্তু ভ্যানওয়ালা আমাকে ডেকে আরও একটি ২ টাকার কয়েন দিলেন। আমি আবারও আমার ভাবনার কাছে পরাজিত হলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম ভাড়া ১০ টাকার কম হবেনা আর ৩ টাকা যে ভাড়া হতে পারে এটা আমার কল্পনাতেই ছিলো না। এই একই জায়গায় পরের দিন আমি ইচ্ছাকৃতভাবে ২০ টাকার নোট দিলেও আমাকে ১৭ টাকা ফেরত দেয়া হয়। 

এভাবে প্রত্যেকবার যখন আমি একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই তখন এটা বুঝতে আমার আর কোন সমস্যা থাকলো না যে এখানকার ভাড়া এরকমই, আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোন ভাড়া নেয়া হচ্ছে না। আর এ কারণেই পঞ্চাশোর্ধ ভ্যানওয়ালা আমার কাছে ৫ টাকা চেয়েছিল। আসলে পুঁজি-বাজার, মুক্ত অর্থনীতি বা বানিজ্যিকীকরণের খারাপ দিকগুলো আমাদেরকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে আমরা সেই খারাপ দিকগুলোকেই স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করে থাকি। মানুষ ঠকানো, বিপদে পড়লে সুযোগ বুঝে বেশি লাভ করা, কোন এলাকায় কাউকে নতুন দেখলে তার কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা এসবই আমাদের বর্তমান সময়ের নিত্য অনুষঙ্গ। আর আমাদের অবচেতন মন সেই নেতিবাচকতাকে যথার্থই আপন করে নিয়েছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক জিনিস বা বিষয়কে অযৌক্তিক বা ভুল বলে মনে করি এবং সেই অযৌক্তিকতা বা ভুলকে টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে অন্যকে সহজ-সরল বা মফিজ বলতেও দ্বিধা করিনা।       

হয়তো ভ্যানওয়ালা চাচা আমার কাছ থেকে ৫ টাকার ভাড়া ৫ টাকাই নিয়েছে। তারপরও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আমাকে এখান থেকে দুটি শিক্ষা নিতে সাহায্য করেছে। প্রথমত, এখানকার ভাড়া একদমই অন্য অঞ্চলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয় বরং এখানকার ভাড়া তুলনামূলক অনেক কম। তারপরও আমাদের মতো হঠাৎ যাওয়া কোন অতিথি পাখির দৃষ্টিতে মনে হওয়া কম ভাড়াকে স্থানীয় প্রেক্ষিতে ন্যায্য হিসেবে বিবেচিত হয় যা দিয়েই তারা তাদের জীবনের দৈনন্দিন চাহিদাগুলো পূরণ করছে। এভাবে আমরা (যাত্রী) যখন বুঝতে পারি যে অপরিচিত হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের কাছ থেকে ন্যায্য ভাড়া নেয়া হচ্ছে তখন ভাড়ার বিনিময়ে যা পাই সেটাকে আর যাই হোক বানিজ্য বলা যায়না। আর তাই আমার অভিজ্ঞতার আলোকে এই এলাকার (নওগাঁ, দিনাজপুর) ভ্যানচালকদের ভ্যান চালানো বা যাত্রী পরিবহণ হচ্ছে সেবা; কখনোই বানিজ্য নয়। 

আর দ্বিতীয়ত, বহিরাগত হিসেবে আমরা একটি এলাকায় কতটা নিরাপদ তা অনেকটা অনুধাবন করা যায় সেই এলাকার দৈনন্দিন যাতায়াত ভাড়া এবং স্থানীয় গণ-পরিবহণ ব্যবস্থার সাথে যারা সম্পর্কিত তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ এবং ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে। স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। আমরা যারা  পেশাগত প্রয়োজনে অন্য জেলা বা থানা বা গ্রামে যাই তখন কাজ ও কাজের গুণগত মান নিয়ে যতটা চিন্তিত থাকি ঠিক ততটুকুই চিন্তিত থাকি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। তাই একটি এলাকার গণ-পরিবহণ ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনা করে খুব সহজেই ঐ এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে  সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে যেটি অবশ্যই ইতিবাচকতাকে নির্দেশ করে। যদিও নিরাপত্তার জন্য এই একটি বিষয় মুখ্য নয়; এর সাথে আরো অনেক বিষয় জড়িত।   

আমরা খুব সহজেই অন্যকে বিচার করি নিজেকে দিয়ে এবং নিজের সাথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে। কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ ভ্যানওয়ালা চাচা আমার ৩০ বছরের জীবনের অভিজ্ঞতায় চপেটাঘাত করে হয়তো এটাই বলার চেষ্টা করলো বাবা, নিজেকে দিয়ে আর সবাইকে বিচার করো না। নিজের সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বের হয়ে আসো। মনটাকে বড় করো আকাশসম। আর নিজেকে যাচাই করে নাও আমার মত এরকম হাজারো মানুষের আয়নায়।     

‘পাঁচ টাকা দিবার লাগবে’ কথাটা অহর্নিশ আমার কানে বাজে আর মনের ভিতর সবসময়ই অনুরণিত হতে থাকে যে, ‘জীবনে চলার পথে প্রতিটি মানুষের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে।’ আসলে অভিজ্ঞতা টাকায় কিনতে পাওয়া যায় না কারন অভিজ্ঞতা কোন পণ্য নয়, অভিজ্ঞতার কোন দোকান নেই , অভিজ্ঞতার দোকান হচ্ছে মানুষ।     

 

Please share with



Name : মোঃ ফারুক হোসাইন
Email : sfaruq.228@gmail.com

Comment Section


Post Your Comment
Name

E-mail

Comment