পথ শিশু ও কিছু কথা

প্রতি বছর খরা, বন্যা, নদী-ভাঙ্গন, গ্রামে কর্ম-সংস্থানের অভাব ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে শহরাঞ্চলে মানুষের আনাগোনা বেড়েই চলেছে। পরিবার- পরিজন নিয়ে শহরাঞ্চলে থাকতে আসা এসব মানুষের বসবাসের স্থান হয় বিভিন্ন নিম্ন আয়ের বসতিতে। যাদের এইসব বসতিতে স্থান সংকুলান হয় না তারা জীবিকার তাগিদে বাস, লঞ্চ, ট্রেন স্টেশনে এবং বিভিন্ন রাস্তার পাশে ভাসমান জীবন-যাপন শুরু করে। স্থানান্তরিত হয়ে আসা এইসব মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে শিশুরা। জীবিকার তাগিদে পরিবারের পাশাপাশি এইসব শিশুদেরকে নামতে হয় রাস্তায়। পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয় টোকাই, হকার, ভিক্ষা ইত্যাদির মত প্রায় ২০০ রকমের ঝুঁকিপূর্ণ কাজকে। এদেরকেই আমরা পথশিশু বলে থাকি। এইসব পথশিশুরা তাঁদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে দিনের পর দিন বঞ্চিত হচ্ছে।

সাধারনত দেখা যায় পথশিশুরা অন্যান্য সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক বেশী রোগে শোকে ভুগে থাকে। বছরের বেশিরভাগ সময় রাস্তায় থাকা, ধুলা-বালি ও ময়লা, শীতে গরম কাপড়ের অভাব, গ্রীষ্মের গরম, বর্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করা, পায়ে জুতা না থাকা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে এসব শিশুরা বেশীরভাগ সময় জ্বর, ও সর্দি-কাশিতে ভুগে থাকে।

এছাড়াও তারা প্রায়ই পাতলা পায়খানা, ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটব্যথা ইত্যাদি বিভিন্ন রোগে ভুগে থাকে। ময়লা-আবর্জনার মধ্যে কাজ করা ও  খাবারের আগে হাত না ধুয়ে খাবার খাওয়ার ফলে তাদের এই রোগগুলিই বার বার হয়ে থাকে। এর পিছনে আরো একটা কারণ অবশ্য আছে সেটা হল খোলা মাঠে বা অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত না ধোয়া অথবা হাত ধোবার ক্ষেত্রে কোন কিছু ব্যবহার না করা। তাদের অসচেতনতার জন্যে একজনের ডায়রিয়া হলে ডায়রিয়ার জীবাণু আশে-পাশের অন্যান্য শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

মাথা ব্যথা, বুক ব্যথা, গ্যাষ্ট্রিক, মাজা ব্যথা, পা ব্যথা, দাঁত ব্যথা ইত্যাদি ব্যথাজনিত রোগের বাইরে চুলকানি, ঘা-পাঁচড়া ও এলার্জিজনিত রোগেও এসব শিশুদেরকে প্রায়ই ভুগতে হয়। চর্ম রোগগুলো টোকাই শ্রেনীর শিশুদের মধ্যে হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।

রাস্তার পাশের খোলা খাবার ও সরাসরি সাপ্লাইয়ের পানি খাওয়ার ফলে শিশুরা মাঝে মধ্যেই জন্ডিসে ভোগে। কৃমি, নিউমোনিয়া ও চিকেন-পক্স পথশিশুদের খুবই সাধারণ কিছু রোগ। এছাড়াও চোখ ওঠা এবং শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত রোগের প্রকোপও তাদের মধ্যে অনেক বেশি থাকে।

এসব রোগের পাশাপাশি দুর্ঘটনাজনিত রোগ যেমনঃ হাত ভাঙ্গা, পা ভাঙ্গা, শরীরের কোনো অংশ কেটে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যায় প্রায়ই তাদেরকে ভুগতে হয়। দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পথশিশুদেরকে পুলিশী নির্যাতনের মুখোমুখিও হতে হয়।  


শারীরিক বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগেও তাদেরকে ভুগতে হয়। চুরি বা ছিনতাই না করেও অনেক সাধারণ শিশুকে পুলিশ, বখাটে শ্রেনী, মাস্তান, রাস্তার পাশের পথচারি, সমাজের বিত্তবান শ্রেনীর কাছে নোংরা ভাষায় গালি, ধমক, চড়-থাপ্পর বা খারাপ কথা শুনতে হয় যা তাদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। প্রায়শই দুঃস্বপ্ন দেখা, মন খারাপ থাকা ইত্যাদি এসব শিশুদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায়। 


জ্বর, সর্দি-কাশি, মাথাব্যথা, পেটব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, চোখ ওঠা, পাতলা- পায়খানা, কেটে যাওয়া ইত্যাদি রোগগুলি নিজে নিজেই সেরে যায়। এইসব রোগের জন্য তাদেরকে কখনো ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগে না (নাকি উপরোক্ত লাইনটি/বাক্যটি হবে- এইসব রোগের চিকিৎসার জন্য তারা সাধারনত কখনোই ডাক্তারের কাছে যায় না)। তবে ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস, পক্স ইত্যাদি রোগ হলে স্থানীয় ফার্মেসি হয় এদের চিকিৎসার একমাত্র স্থান। ডাক্তারের কোন পরামর্শ ছাড়াই এসব ফার্মেসি থেকে তারা হর-হামেশাই ঔষধ কিনে খাচ্ছে। কোন সার্টিফিকেট না থাকলেও ঔষধের দোকানের মালিক ডাক্তারের ভূমিকায়ই চিকিৎসা করে যাচ্ছে।

বুক ব্যথা, পা ব্যথা, মাজা ব্যথা, দাঁত ব্যথা ইত্যাদি ব্যথাজনিত রোগের জন্য এসব শিশু এবং তাদের পরিবার স্থানীয় কবিরাজের উপর বেশী মাত্রায় নির্ভরশীল। চুলকানি, ঘা-পাঁচড়া, এলার্জির জন্যেও শিশুরা কবিরাজ ও রাস্তার পাশের ভাসমান ঔষধ বিক্রেতার উপর নির্ভর করে।

উপরে উল্লেখিত রোগের বাইরে আরো কিছু রোগ যেমনঃ জন্ডিস, নিউমোনিয়া, দূর্ঘটনাজনিত আঘাত, হাঁপানি ইত্যাদি রোগের কারনে পথশিশুরা মাঝে মাঝে সরকারি হাসপাতালে যায় কম খরচে চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় বলে। কিন্তু অন্যান্য সাধারণ রোগের জন্যে ডাক্তার বা সরকারি হাসপাতালগুলিতে স্বাস্থ্যসেবা নিতে না যাওয়ার অন্যতম কারণ হল- সরকারি হাসপাতালগুলিতে ভিড় থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে হয়। কিছু কিছু সময় ডাক্তাররা দেরীতে হাসপাতালে আসে এবং নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করে চলে যায়। যার ফলে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কিছু কিছু রোগীকে একের অধিক দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসতে হয়। এতে করে তাদের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্যে আলাদা ডাক্তার বা শিশুবেডের ব্যবস্থা না থাকা বা থাকলেও তা অনেক স্বল্প পরিসরে থাকা যা শিশুদের এসব সরকারি হাসপাতালে আসতে নিরুৎসাহিত করে।

বিভিন্ন রোগে ফার্মেসি, কবিরাজ ও রাস্তার পাশের ঔষধ বিক্রেতাদের দেওয়া ঔষধ সেবন করে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠলেও প্রায়ই ভুল চিকিৎসার ফলে রোগীর অবস্থা খারাপ হয় বা রোগ সারতে অনেক দেরী হয়। একদিকে সহজ স্থানীয় চিকিৎসা অন্যদিকে হাসপাতালে যাওয়ার ভোগান্তি। ফলে তারা সহজ স্থানীয় চিকিৎসা সেবাকেই গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
মানসিক বিভিন্ন রোগ যেমনঃ দুঃস্বপ্ন দেখা, ভয় পাওয়া, দুঃচিন্তা করা ইত্যাদির জন্যে তারা স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাওলানার পানি পড়ার উপর নির্ভরশীল। তাদের ধারনা দোয়া-কালাম পড়ে হুজুর ফু দিলে বা পানি পড়ে দিলে তাদের রোগ ভালো হয়ে যাবে।
গ্রামাঞ্চলের শিশুদের তুলনায় শহরের এইসব পথশিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা অনেক কম। শহরের এইসব পথশিশুদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রকোপও গ্রামের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু কিভাবে এই শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে বা স্বাস্থ্যসেবার মান আরও ভালো করা যেতে পারে? 


শিশুদেরকে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিনামূল্যে মুখের মাস্ক দেওয়া যেতে পারে। রাস্তার পাশে, বিভিন্ন মোড়ে, বাজারে বা বাস টার্মিনালে শিশুদের জন্যে স্বাস্থ্যকর পায়খানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিয়মিত নখ কাটা, ছাই বা মাটির বদলে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম করা যেতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধির উপায় হিসেবে বড় ব্যানারে কার্টুনের ছবি ব্যবহার করে বিশেষ করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এই ব্যানারগুলো টানিয়ে তাতে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ছবি প্রদর্শন করা যেতে পারে। টিভিতে শিশুদের জন্যে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে যেমনটি আগে মিনা কার্টুনের মাধ্যমে করা হতো। সর্বোপরি এইসব শিশুরা যেহেতু দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় কাজ করে বা এদের অবসর অনেক কম থাকে তাই সন্ধ্যার পর এদের জন্যে ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পেইন ও ফ্রি ঔষধ সরবরাহ করা যেতে পারে। নিরাপদে ঘুমানোর ব্যবস্থা স্বরূপ বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কে করবে তাঁদের জন্যে এতসব আয়োজন......???

Please share with



Name : Meraz Ahmed
Email : merazeco@gmail.com

Comment Section


Post Your Comment
Name

E-mail

Comment