স্থানীয় মূল্যায়ন: স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম

প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে খাদ্য কর্মসূচী একটি অতি গুরুত্বপূর্ন ও যুগোপযোগী প্রোগ্রাম। এই ‘স্কুল ফিডিং কর্মসুচীর’ নানাবিধ প্রভাব নিয়ে হয়েছে অসংখ্য গবেষণা, হয়েছে সেমিনার, হয়েছে কর্মশালা, হয়েছে জ্ঞানমুলক অনেক আলোচনা-সমালোচনা। বাংলাদেশে ‘স্কুল ফিডিং কর্মসুচী’র বয়স  অর্ধযুগ পার হলেও এ সম্পর্কে আমার খুব বেশি জানাশোনা ছিলনা।সম্প্রতি একটি গবেষণা কর্মের(Impact study of school feeding program) সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে ‘‘স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম” সম্পর্কে জানার কিছুটা সুযোগ পেয়েছি। ‘স্কুল ফিডিং কর্মসুচী’র আওতায় অপেক্ষাকৃত দরিদ্য্ এলাকার কিছু স্কুলে বিস্কুট এবং কিছু স্কুলে খিচুড়ী দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে সকল স্কুলে বিস্কুট দেয়া হয় সেখানে সপ্তাহে ৬ দিন বিস্কুট দেয়া হয় অন্যদিকে যেখানে খিচুড়ী দেয়া হয় সেখানে সপ্তাহে ৫ দিন খিচুড়ী আর একদিন বিস্কুট দেয়া হয়। স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের নুন্যতম কিছু পুষ্টি চাহিদা পুরণ এবং স্কুলের উপস্থিতির হার বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা হলো এই ‘স্কুল ফিডিং কর্মসুচির প্রধান উদ্দেশ্য। তাই এই কর্মসুচির আওতায় যে বিস্কুট এবং খিচুড়ি দেয়া হয় তা অতি উচ্চ মাত্রায় পুষ্টিগুন সম্পন্ন। বিস্কুটের ক্ষেত্রে সরাসরি প্যাকেটজাত বিস্কুট সরাসরি বাচ্চাদরে হাতে দেয়া হলেও খিচুড়ীর ক্ষেত্রে দেখা যায় বিশেষ চিত্র। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত রাধুনী দ্বারা স্কুলেই রান্না করা হয় খিচুড়ী এবং সেই খিচুড়ীর মান নিয়ন্ত্রনের জন্য রয়েছে এনজিও পরিচালিত মনিটরিং কমিটি। ‘স্কুল ফিডিং কর্মসুচী’র ভালোমন্দ দিক নিয়ে যেমন থেমে নেই সমাজ বিজ্ঞানী,চিকিৎসা বিজ্ঞানীর ও পুষ্টি বিজ্ঞানীদের গবেষণা তেমনী থেমে নেই মিনি পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত চায়ের দোকান,মাঠ,ঘাট ও বাজারে এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা। গ্রামের এই সকল অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন সব বিষয় ও তথ্য যা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়া একজন সামাজিক গবেষকের পক্ষে সম্ভব নয়। সম্প্রতি জামালপুর জেলায় স্কুল ফিডিং নিয়ে কাজ করতে গিয়ে স্কুল ফিডিং তথা বিস্কুট ও খিচুড়ী নিয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের অসাধারণ সব কথাবার্তা আমার দৃষ্টিকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে আর স্থানীয় মানুষের এই অসাধারণ কথাবার্তার পটভুমিতেই নির্মিত হয়েছে এই লেখার সমস্ত রসদ।

বিস্কুট

বিস্কুটের যে বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা শ্রেনী তথা গ্রামের সাধারন মানুষ সবচাইতে বেশি কথা বলে তা হলো বিস্কুটের ক্ষুধা নিবারন ক্ষমতা। প্রায় সব বাচ্চার মায়েরাই এটি বলে থাকেন যে বিস্কুট খেলে ক্ষুধা কম লাগে, ‘‘স্কুল ছুটির সময় বিস্কুট খেয়ে বাড়িতে এসে তারা সাথে সাথেই খেতে চায়না কমপক্ষে ১/২ ঘন্টা পরে তারা খায়তে” চায়। বিস্কুটের ফলে বাচ্চার পুষ্টি চাহিদা পুরণ হচ্ছে কিনা তা বাচ্চার মায়েরা ঠিক করে বলতে না পারলেও বিস্কুট খাওয়ার ফলে যে তাদের বাচ্চার ক্ষুধা নিবারণ হচ্ছে তা বলতে তারা কৃপনতার পরিচয় দেননি। বিস্কুটের ক্ষুধা নিবারণের এই ক্ষমতা আবার পরোক্ষভাবে পরিবারের অর্থ বাচাতে ভুমিকা রাখছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জের এক শিশুর বাবা বলেন ‘‘আমার মেয়ে স্কুলে বিস্কট পায় যার ফলে দোকানে খাবারের জন্য তাকে আর আলাদা টাকা দিতে হয় না ফলে কিছু টাকা আমার সংসারে থেকে যায়। 

স্কুলের বিস্কুট খেতে কতটা আরামদায়ক কিংবা কতটা কষ্টকর তা বলতেও ছাড়েননি গ্রামের সাধারন মানুষজন। তাদের কথায় বিস্কুট নাকি অনেক শক্ত যা অনেক বাচ্চার পক্ষেই খাওয়া বেশ কষ্টকর। আবার এই বিস্কুট খাওয়ার পরে পানি না খেলে নাকি দাঁতে পোকাও ধরে। বিস্কুট নিয়ে মজার আর একটি তথ্য হলো স্কুলের সকল বাচ্চার জন্য বিস্কুট বরাদ্দ থাকলেও অনেক মা তা নিতে চায় না। সংখ্যায় কম হলেও এরকম কিছু পরিবার পাওয়া গেছে যারা স্কুলের বিস্কুট তাদের বাচ্চাদেরকে খেতে দিতে চায়না আর সেজন্য তারা স্কুলে গিয়ে শিক্ষককে নিষেধ পর্যন্ত করেছেন বলে জানা যায়। তাদের অভিযোগ বিস্কুট খেলে তাদের বাচ্চার পেটে সমস্যা হয় এমনকি ডায়রিয়াও হয়। 

আধুনিক যুগের শহুরে মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক ঘেয়েমি অপেক্ষা পরিবর্তন ও বৈচিত্রতাকে বেশি পছন্দ করি। এই তত্ত্বের খুব বেশি ভিন্নতা দেখা যায়না গ্রামীণ সমাজেও তাইতো গ্রামের সাধারন মানুষজনও দীর্ঘদিন একই ধরনের বিস্কুটের প্রতি তিক্ততা প্রকাশ করেন এভাবে যে ‘‘ একই বিস্কুট বাচ্চারা প্রতিদিন খেতে চায়না, এক জিনিস কি প্রতিদিনই ভালো লাগে, একই বিস্কুট খাইতে খাইতে বাচ্চারা বিরক্ত হয়ে গেছে” ইত্যাদি। কমিউনিটির মানুষজনের সাথে কথা বলে জানা গেল সপ্তাহের ৬ দিনই একই খাবার দেয়ার ফলে তার প্রতি বাচ্চাদের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিস্কুটের প্রতি বাচ্চাদের অনাগ্রহের কথা বলতে গিয়ে এক বাচ্চার মা বলেন ‘‘আমার বাচ্চা বিস্কুট খেতে চাইনা একটা দুইডা খাইলে খায় আর বাকিগুলো টেবিলের উপর ফেলে রাখে যেগুলো পিপড়ায় খায়”।  

বিস্কুট বিতরন নিয়েও রয়েছে কমিউনিটির মানুষের অসাধারন সব মতামত। বিস্কট যে প্রতিদিনই বাচ্চাদের দেয়া হয় এবং সব বাচ্চাই যে প্রতিদিন বিস্কুট পায় সে বিষয়ে তাদের কোন সন্দেহ নাই। তবে তারা সন্দেহ পোষণ করে বাচ্চাদেরকে ঠিক পরিমানমত বিস্কুট দেয়া নিয়ে। অনেক স্কুলে এখন বিস্কুট দেয়া হয় প্যাকেট খুলে আর এই খোলা প্যাকেট থেকেই সন্দেহের সুত্রপাত। এক বাচ্চার মা বলেন ‘‘বিস্কুট যদি কমই না দেয়া হবে তবে কেন বিস্কুটের প্যাকেট খুলে দেয়া হয়”। অবশ্য বিস্কুটের প্যাকেট খুলে দেওয়ার কারন হলো যাতে বাচ্চারা স্কুলেই বিস্কুট খায়। অর্থাৎ স্কুলেই বিস্কুট খাওয়া নিশ্চিত করতেই বিস্কুটের প্যাকেট খুলে তা বিতরনের সিস্টেম চালু করা হয়েছে বলে জানা গেছে স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে। আবার তারা(গ্রামের মানুষজন) অভিযোগ করে বলেন যে স্যাররা বিস্কুট চুরি করে বাড়ি নিয়ে যায় এবং সেগুলো নিজেদের আতœীয় স্বজনদের মধ্যে বিতরন করে দেয়। বিস্কুট বিতরন নিয়ে কমিউনিটির মানুষের এই সকল অভিমত বৈজ্ঞানিকভাবে সিদ্ধ না হলেও তা যে একদমই অমুলক কোন বিষয় নয় তা বলাই যায়। কারন বিস্কুট বিতরনের অসামঞ্জ্যতা লক্ষ্য করা যায় স্কুলের বিস্কুট বিতরনের তালিকা দেখে। এমন কিছু স্কুল পাওয়া গেছে যেখানে দৈনিক হাজিরা খাতায় বাচ্চাদের যে উপস্থিতি পাওয়া গেছে তার চাইতে বিস্কুট বিতরনের হাজিরা খাতায় উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। কমিউনিটিতে এমন কথারও প্রচলন আছে যে স্যাররা বেশি উপস্থিতি দেখিয়ে বিস্কুট বাড়ি নিয়ে যায়।

খিচুড়ী

স্কুলে যে খিচুড়ী ছাত্রছাত্রীদেরকে খেতে দেয়া হয় তা অনেক আয়োজন করেই করা হয়ে থাকে। একজন প্রশিক্ষিত বাবুর্চি দ্বারা স্কুলেই রান্না হয় খিচুড়ী। যে খিচুড়ী স্কুলে রান্না হয় তা চাল, ডাল আর সবজির মিশ্রন বাংলা কথায় এই খিচুড়ীকে বলা হয় সবজি খিচুড়ী। এই খিচুড়ীর জন্য যে সবজি দেয়া হয় তা আসলে গ্রামেরই প্রশিক্ষিত নারী সবজি উৎপাদকের কাছ থেকে নেয়া হয় আর চাল, ডাল এবং যাবতীয় মশলা সবই আসে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম থেকে। উল্লেখ্য যে প্রতি স্কুলের জন্য ৩০ জন স্থানীয় নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সবজি উৎপাদক হিসেবে তৈরি করা হয় যারা নিজেরা বাড়িতে বা মাঠে সবজি উৎপাদন করে থাকে।

বিস্কুটের মত খিচুড়ীও বাদ যায়নি কমিউনিটির সাধারন মানুষের আলোচনা থেকে।তবে খিচুড়ী সম্পর্কে সবচাইতে বেশি কথা প্রচলিত আছে তা হলো খিচুড়ীর গুনগত মান নিয়ে। খিচুড়ীর মান তথা খিচুড়ীর স্বাদ নিয়ে কমিউনিটির মানুষজন একদমই সন্তুষ্ট নয়। বাচ্চার মায়েরা অভিযোগ করে বলেন যে ‘‘খিচুড়িতে কোন মসলা দেয়না যার ফলে খিচুড়ী পানি পাতলা হয়ে থাকে যা বাচ্চারা খেতে চায়না”।  অনেক ঘটা করে খিচুড়ী ছাত্রছাত্রীদের জন্য রান্না করা হলেও অনেকক্ষেত্রে এই খিচুড়ীর ভোক্তা হিসেবে মানুষের পরিবর্তে পশুপাখিকে দেখতে পাওয়া যায়। এক বাচ্চার মা বলেন ‘‘আগে খিচুড়ী বাড়িতে নিয়ে আসলে সেটা খাবার জন্য আমার মেয়েরা কাড়াকাড়ি করতো আর এখন যে খিচুড়ী নিয়ে আসে তা আমার মেয়েরা তাকিয়েও দেখে না সেটা আমাদের মুরগীতে খায়”। আবার একটি বাড়িতে খানা জরিপ চলাকালীন সময়ে দেখা যায় স্কুল থেকে আনা খিচুড়ী বাড়ির গরুকে দিতে ।  

 

কমিউনিটির মানুষের মাধ্যমে জানতে পারি যে আগে এক সময় খিচুড়ীর মধ্যে গোশত কিংবা ডিম দেয়া হত যেটা এখন আর দেয়া হয়না। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় একটি গ্রামের মধ্য দিয়ে হাটার সময় রাস্তার পাশেই থাকা পুকুরে গোসল করতে থাকা ছোট বাচ্চার আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে ‘‘ স্যার আমগো যে খিচুড়ি দেয় তা ভাললাগে না, খিচুড়ীতে গোসত আর ডিম দেবেন স্যার”। একই ভাবে রাস্তার আশেপাশে দাড়িয়ে থাকা অনেক নারী পুরূষই আমাদেরকে শোনানোর জন্য অনেক কথা বলতে থাকে  যেমন ‘‘স্কুলে যে খিচুড়ী দেয় তা খাইতে পারেনা, শুদা খিচুড়ী কি বাচ্চারা খায়”, ‘‘সরকার যখন খাওয়াইবো তখন ভালা কইরা খাওয়াইলেই পারে”, ‘‘স্কুলের সারেরা গোশত ডিম মাইরা পোলাগো হুদা খিচুড়ী খাওয়াই”,পুঁইশাক দিয়ে রান্না করা খিচুড়ী আমগো পোলা খাইতে চাইনা”, স্যারেদেও জন্য আলাদা খিচুড়ি রান্না করা হয়”। কমিউনিটির এসব কথা শুনে এটা স্পষ্টতভাবে বোঝা যায় যে খিচুড়ী সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা একদমই সুমধুর নয় বরং তিক্তকায় ভরপুর।  খিচুড়ীতে বাচ্চারা যে কি পরিমান বিরক্ত তা বোঝা যায় এক চাচার মজার এক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। চাচা বলেন ‘‘ স্কুলের পাশেই দাড়িয়ে ছিলাম এমন সময় দেখছি এক ছাত্র দৌড়াচ্ছে আর তার পিছনে ছুটছে স্কুলের এক স্যার। স্যার ছাত্রের পিছনে বাটি হাতে ছুটছে আর ছাত্রকে থামতে বলছে। আমি বিষয়টি দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম যে ছাত্রটি খিচুড়ি খাবেনা বলে চলে যাচ্ছে আর স্যার জোর করে তাকে খিচুড়ি খাওয়াতে চাচ্ছে”।  

 

খিচুড়ী হোক কিংবা বিষ্কুটই হোক স্কুল ফিডিং কর্মসুচী’যে অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ তা পদ্ধতিগতভাবে সিদ্ধ গবেষণা দ্বারা প্রমানিত। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় কমউিনিটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। যদি কমিউনিটির মানুষের মাঝে ইতিবাচক দিক তৈরি না করা যায়- তাহলে এই ধরণের ভালো উদ্যোগ গুলো হয়  ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে কিংবা লক্ষ্য অর্জনে বাধাগ্রস্থ হবে। তাই কমিউনিটিতে বিদ্যমাণ ধারনাগুলো বলে দিচ্ছে সময় এসেছে কর্মসুচীর সংযোজন কিংবা বিয়োজনের। বাঙ্গালীরা রসনা প্রিয়। তাই তাদের খাদ্য তালিকায় স্বাদ, তৃপ্তি আর ভিন্নতার উপস্থিতি অতীব জরুরী। পুষ্টি আর বিশ্বমান এর পাশাপাশি প্রস্তুত আর পরিবেশনে স্থানীয়করণটা মাথায় রেখে স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে বিবেচনা করলে এটি বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।     

Please share with



Name : মো: ফারুক হোসেন
Email : sfaruq.228@gmail.com

Comment Section


Post Your Comment
Name

E-mail

Comment